Sunday, January 30, 2022

ইলমে তাছাউফ কি?


ইলমে তাছাউফ কি?


সহজ কথায় ইলমে তাছাউফ হচ্ছে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধি অর্জন করার জন্য যে ইলম বা জ্ঞান সেটার চর্চা করা। এ কথায় যদি বলা যায় তাহলে যে সকল কু-প্রবৃত্তি মানুষকে আল্লাহ পাক এবং উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের পাওয়ার পাথে প্রতিবন্ধকতা স্মরূপ সে সকল কু-প্রবৃত্তি দূর করে উত্তম প্রবৃত্তি বা ভালো গুনাবলি অর্জন করার রাস্তাই হচ্ছে ইলমে তাছাউফ। অর্থাৎ লোভ, হিংসা, পরশ্রিকাতরতা, রিয়া, অহংকার, রাগ, মিথ্যা, প্রতারণা, কৃপণতা, ধোঁকা, গীবত ইত্যাদি মন্দ স্বভাব দূর করে তার বিপরীতে তওবা, ধৈর্য, শোকর গুজার হওয়া, আল্লাহভীতি, পরহেযগারীতা, সত্যবাদিতা, অল্পে তুষ্ট থাকা, ভালোবাসা ইত্যাদি ভালো স্বভাব অর্জন করার যে ইলম সেটাই হচ্ছে ইলমে তাছাউফ। এই ইলমকে তাযকিয়ায়ে নফস/ তাযকিয়ায়ে ক্বলব অর্থাৎ নফস এবং ক্বলব পরিশুদ্ধিকরণ ইলমও বলা হয়। হাদীছ শরীফের ভাষায় এই ইলমকে উপকারী ইলম বলা হয়েছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ: " ‌الْعِلْمُ ‌عِلْمَانِ: ‌عِلْمٌ ‌فِي ‌الْقَلْبِ فَذَاكَ الْعِلْمُ النَّافِعُ، وَعِلْمٌ عَلَى اللِّسَانِ فَذَاكَ حُجَّةُ اللَّهِ عَلَى ابْنِ آدَمَ

হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন ‘ইলম দুই প্রকার। এক প্রকার ইলম হল ক্বলবের ইলম যা উপকারি ‘ইলম। আর অপর প্রকার ‘ইলম হল জবানের ইলিম, আর এটা হল আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে আদম সন্তানের জন্য দলীল। (মুছান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ৩৪৩৬১, আয যুহুদ ওয়ার রকায়িক্ব লি আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক ১১২১)


এ হাদীছ শরীফ থেকে আমরা জানতে পারলাম জবানী ইলম বা ইলমে শরীয়তের ইলম দিয়েই মূলত উপকার হাসিল করা যাবে না বরং শরীয়তের ইলম বা কুরআন শরীফ হাদীছ শরীফ, ইজমা কিয়াস থেকে দলীল দ্বারা আমলের দলীল শিক্ষা করার পাশাপাশি ইলমে তাছাউফ অর্জন করে অন্তর পরিশুদ্ধ করে উপকার অর্জন করতে হবে। 


আল্লাহ পাক বলেন,

اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰی عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ.

অর্থ: নিশ্চয়ই সালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। (সূরা আনকাবূত : ৪৫)


অনেক মানুষকে দেখা যায় নামাজ আদায় করার পাশাপাশি বিভিন্ন অন্যায় বা অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতে। এর কারন কি? এর কারণ হচ্ছে এই শ্রেনীর মানুষ অন্তর পরিশুদ্ধ করেনি বা উপকারী ইলম অর্জন করেনি যেকারনে তার শুধুমাত্র শরীয়তের ইলম ও আমল তাকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বাঁচাতে পারছে না। 


আর সেটাই মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,

قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ‎

অর্থ: যে তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি অর্জন করে সে সাফল্য অর্জন করেছে। (সূরা আ’লা ১৪)


দুনিয়ার বদ তাছির ও শয়তানের ধোঁকা মানুষের অন্তর কলুষিত করে দেয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন অন্তর দিয়ে বান্দার পক্ষে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করার আর পথ থাকে না। আল্লাহ পাক বলেন,

كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ

কখনও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। (সূরা আল মুতাফফিফীন: আয়াত শরীফ ১৪)


আর সে বিষয়টাই হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম তিনি হাদীছ শরীফে স্পষ্ট করেছেন,

أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ‏.‏ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ

জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল ক্বলব (বুখারী শরীফ : হাদীছ শরীফ ৫২, সহীহ মুসলিম ১৫৯৯)


অর্থাৎ ক্বলব বা অন্তর পরিশুদ্ধি করাই হচ্ছে হচ্ছে অন্যতম কাজ, কারন তা পরিশুদ্ধ না হলে সবকিছুই বরবাদ হয়ে যায়। অপরিশুদ্ধ অন্তর থেকেই বান্দার দ্বারা সকল মন্দকাজের উৎপত্তি হয়। এ কারনে দেখা যায় একজন হাজী সাহেব হয়েও তার দ্বারা প্রতারনা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা প্রকাশ পায় না, নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়েও মিথ্যাচার করছে মানুষকে ঠকাচ্ছে, সারাদিন রোজা রেখেও অশ্লীল সিনেমা দেখছে গানবাজনা শুনছে। নাউযুবিল্লাহ!


এ কারনে আল্লাহ পাক সতর্কবানী উচ্চারন করে ঘোষনা দিয়েছেন,

يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ ‎‏ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

সে দিবসে ধন সম্পদ ও সন্তান সন্তুতি কারো কোন উপকারে আসবে না, যে আল্লাহ পাকের কাছে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে এসেছে সে ব্যাতীত (সূরা শুয়ারা আয়াত ৮৮-৮৯)


এই আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে কলব অর্জনের মাধ্যমেই একমাত্র সফলতা অর্জিত হয়। এর কোন বিকল্প নেই। শুধুমাত্র কিতাব পড়ে বা আয়াত শরীফ পড়েই সবকিছু হয়ে যাবে না বরং অন্তর পরিশুদ্ধও করতে হবে। যা আল্লাহ পাক উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন,

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ 

আল্লাহ পাক ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। (সূরা আল ইমরান ১৬৪)


এ আয়াত শরীফ থেকেই প্রমাণ হলো হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধুমাত্র কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ শিক্ষাই দেননি বরং আত্মশুদ্ধির যে ইলম সেই ইলমে তাছাউফও শিক্ষা দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!


ইলমে তাছাউফের গুরুত্ব বিষয়ে বিখ্যাত আলেমে দ্বীন শায়েখ যুরউক রহমতুল্লাহি আলাইহি (ওফাত ৮৯৯ হিজরী) তিনি বলেন,

 نسبة التصوف من الدين نسبة الروح من الجسد

অর্থ: শরীর সাথে রূহের সম্পর্ক যেমন, দ্বীন ইসলামে তাছাউফের সম্পর্কও তেমন। (ঈকাযুল হিম ১/৮)


এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম রূহ ছাড়া যেমন শরীরের কোন মূল্য নাই তেমন তাছাউফ অর্জন ছাড়া দ্বীন ইসলামের কোন ভিত্তীও নাই। 

সর্বপরি বান্দা ও উম্মত যখন ইলমে শরীয়ত শিক্ষা করার পাশাপাশি ইলমে তাছাউফও চর্চা করে বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করে, সেই সকল বান্দাদের উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,


 يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي ‏ وَادْخُلِي جَنَّتِي 


হে প্রশান্ত অন্তরের অধিকারী ! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং জান্নাতে প্রবেশ করো। (সূরা ফযর ২৬-২৯)


No comments:

Post a Comment

দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে বারো বাজারে পর্যটন নগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে মুহম্মদ আলী রেজা রাজু

  দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে বারো বাজারে পর্যটন নগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে মুহম্মদ আলী রেজা রাজু  ভাই তোমার জন্য শুভ...