এক ব্যক্তি আলিম ছিলেন। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিন দিন যাবৎ কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল আশুরা শরীফের দিন। তিনি আশুরা শরীফ উনার দিনে ভাল খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে জানতেন।
তখন ছিল কাজীদের (বিচারক) যুগ। কাজী ছাহেব ধনী ব্যক্তি ছিল। তার কাছে আশুরা শরীফ উনার ফযীলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থতা ও পরিবারের অভুক্ত থাকার কথা এবং আশুরা শরীফ উনার দিন ভাল খাওয়ার ফযীলতের কথা উল্লেখ করে দশ সের আটা, দশ সের গোশত ও দুই দিরহাম চাইলেন যে, ‘এই পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য হাদিয়া অথবা কর্জ হিসেবে দিন।’
কাজী ছাহেব উনাকে যোহরের সময় আসতে বললো। যোহরের সময় কাজী ছাহেব বললো, আছরের সময় আসতে। কিন্তু এরপরে আছরের সময় মাগরিব, মাগরিবের সময় ইশা এবং ইশার সময় সরাসরি নিষেধ করে দিলো।
তখন আলিম ব্যক্তি বললেন, হে কাজী ছাহেব! আপনি আমাকে দিতে পারবেন না সেটা আগেই বলতে পারতেন, আমি অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু তা না করে আমাকে সারাদিন ঘুরিয়ে এই শেষ মুহূর্তে নিষেধ করছেন?
কাজী ছাহেব সেই আলিম ব্যক্তির কথায় কর্ণপাত না করে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।
মনের দুঃখে আলিম ব্যক্তিটি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। পথে ছিলো এক খ্রিস্টানের বাড়ি।
একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খ্রিস্টান উনাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু বিধর্মী বিধায় খ্রিস্টানকে প্রথমে তিনি কিছু বলতে চাইলেন না।
অতঃপর খ্রিস্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি আশুরা শরীফ উনার ফযীলত ও কাজী ছাহেবের সাথে সংঘটিত ঘটনার কথা ব্যক্ত করলেন।
খ্রিস্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে উনাকে আশুরা শরীফ উনার সম্মানার্থে দশ সের আটা, দশ সের গোশত, দুই দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও বিশ দিরহাম দিতে চাইলো।
সে খ্রিস্টান হওয়ার আলিম ব্যক্তি তা নিতে চাইলেন না। খ্রিস্টান ব্যক্তির অত্যাধিক উৎসাহের কারণে আলিম ব্যক্তি সেগুলো কর্জ হিসেবে নিতে রাজী হলেন।
তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি উক্ত আলিম সাহেবকে আশুরা শরীফ উনার সম্মানার্থে দশ সের আটা, দশ সের গোশত, দুই দেরহাম এবং অতিরিক্ত আরো বিশ দিরহাম দিলো।
দিয়ে খ্রিস্টান ব্যক্তি অনেক কাকুতি-মিনতি করে আরজু করলো যে, আমি এগুলো আপনাকে আশুরা শরীফ উনার সম্মানার্থে হাদিয়া দিতে চাই আপনি দয়া করে কবুল করুন এবং আপনাকে আমি আশুরা শরীফ উনার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিতে চাই।
তার কাকুতি-মিনতির কারণে আলিম সাহেব কবুল করলেন। অতঃপর ঐ আলিম ব্যক্তি তখন তা নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং খাবার তৈরি করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করলেন।
অতঃপর দোয়া করলেন, “আয় আল্লাহ পাক! যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো, আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফোটালো, আল্লাহ পাক! আপনি তার দিল খুশি করে দিন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন।”
ওই রাতে কাজী ছাহেব স্বপ্ন দেখলো, স্বপ্নে কাজী ছাহেবকে বলা হচ্ছে, হে কাজী ছাহেব! তুমি মাথা উত্তোলন করো। মাথা তুলে কাজী ছাহেব দেখতে পেলো যে, তার সামনে দু’টি বেহেশতের বালাখানা। একটি স্বর্ণের বালাখানা আরেকটি রৌপ্যের বালাখানা।
কাজী ছাহেব বললো, ‘আয় আল্লাহ পাক! এ দু’টি কি?’ গায়েবী আওয়াজ হলো, ‘এ দু’টি বেহেস্তী বালাখানা। তখন কাজী সাহেব জানতে চাইলো কার জন্য? বলা হলো এ বালাখানা দু’টি তোমারই ছিলো। কিন্তু এখন আর তোমার নেই।
কারণ তোমার কাছে যে আলিম লোকটি আশূরা শরীফ উপলক্ষে সহযোগিতার জন্য এসেছিলেন উনাকে তুমি সহযোগিতা করনি। এখন বালাখানা দু’টি ওমুক খ্রিস্টান লোকের হয়েছে।’
কারণ উক্ত খ্রিস্টান ব্যক্তি সেই আলেম সাহেবকে আশুরা শরীফ উনার সম্মানার্থে সাহায্য করেছে। এটা শুনে ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার কারণে কাজী ছাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘুম থেকে উঠে ওজু ও নামায আদায় করে খুব সকালেই সেই খ্রিস্টানের বাড়িতে গেলো।
খ্রিস্টান ব্যক্তির সকালে উঠার অভ্যাস ছিলোনা। কিন্তু দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনে উঠে দরজা খুলে খ্রিস্টান ব্যক্তি কাজী ছাহেবকে দেখে বিস্ময়াভুত হলো।
কারণ কাজী ছাহেব খ্রিস্টানের পড়শি হওয়া সত্ত্বেও জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো সময় তার বাড়িতে আসতে দেখেনি।
অতঃপর খ্রিস্টান কাজী ছাহেবকে বললো, ‘আপনি এতো সকালে কি জন্য এলেন?’ কাজী ছাহেব বললো, ‘হে খ্রিস্টান ব্যক্তি! তুমি গত রাত্রে যে নেক কাজ করেছো তা আমার কাছে বিক্রি করে দাও। আমি তোমাকে এক লাখ দেরহাম দিবো। কাজী ছাহেবের কথায় খ্রিস্টান লোকটি আশ্চর্য হলো।
সে বললো, কাজী ছাহেব! আমি আপনার কথার কিছুই বুঝতেছি না। আপনি কেন আমাকে এক লাখ দেরহাম দিবেন। তখন কাজী ছাহেব পুনরায় বললো, হে খ্রিস্টান ব্যক্তি! তুমি গত রাতে যে নেক কাজ করেছো তা আমার কাছে বিক্রয় করে দাও।’
আমি তোমাকে এক লাখ দেরহাম দিবো। তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, আমার খেয়ালে আসে না যে, আমি গতরাতে কোনো উল্লেখযোগ্য নেক কাজ করেছি। তবে আপনি যদি জেনে থাকেন তাহলে আমাকে বলতে পারেন।
তখন কাজী ছাহেব বললো, তুমি গত রাতে আশূরা শরীফ উপলক্ষে এক আলিমকে দশ সের আটা, দশ সের গোশত, দুই দিরহাম এবং তার সাথে আরো বিশ দিরহাম হাদিয়া করেছো এবং প্রতি মাসে উনাকে এ পরিমাণ হাদিয়া দেয়ার ওয়াদা করেছো।
খ্রিস্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করলো। কাজী ছাহেব বললো, তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি উনার সাথে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি উনাকে তা দিয়ে দিবো।’
খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, হে কাজী ছাহেব! আপনি কি জন্য এই সামান্য হাদিয়া করার বিনিময়ে আমাকে এক লক্ষ দিরহাম দিবেন সেটা স্পষ্ট করে বলুন?
তখন কাজী ছাহেব তার স্বপ্নের কথা খুলে বললো যে, এই আলিম আশূরা শরীফ উপলক্ষে আমার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলো আমি তাকে সহযোগিতা করিনি।
যার কারণে রাতের বেলা আমাকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের দ্বারা তৈরি বেহেশতের দু’টি বালাখানা স্বপ্নে দেখিয়ে বলা হয়েছে, হে কাজী ছাহেব! ‘এ বালাখানা দু’টি তোমার ছিলো। কিন্তু এখন আর তোমার নেই।
কারণ তোমার কাছে যে আলিম ব্যক্তিটি আশূরা শরীফ উপলক্ষে সহযোগিতার জন্য এসেছিলেন উনাকে তুমি সহযোগিতা করনি। অমুক খ্রিস্টান সহযোগীতা করেছে সে জন্য এ বালাখানা দু’টি এখন ওমুক খ্রিস্টান লোকের হয়েছে।’
তখন কাজী ছাহেব বললো, তুমি তো খ্রিস্টান। তুমি তো এই বালাখানা পাবে না। কারণ, ইসলাম আসার পরে পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্ম বাতিল হয়ে গেছে। কাজেই সেই ধর্মের উপর যারা থাকবে তারা জান্নাত লাভ করতে পারবে না। তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, হে কাজী ছাহেব! আমি কিভাবে সেই বালাখানা লাভ করতে পারবো?
সেই বালাখানার মালিক হওয়ার কোন সুযোগ কি আমার জন্য আছে? তখন কাজী ছাহেব বললো, হ্যাঁ, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হও তাহলে তুমি বালাখানা লাভ করতে পারবে।
তখন খ্রিস্টান ব্যক্তি বললো, হে কাজী ছাহেব! যদি ইসলাম গ্রহণ করলে সেই জান্নাতী বালাখানা লাভ করা যায়, তাহলে আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি এক্ষণি কালিমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম।” সুবহানাল্লাহ!
তখন লোকটি বললেন এখন কি আমি বালাখানা পাব? কাজী ছাহেব বললেন, হ্যাঁ, এখন আপনি বালাখানা পাবেন। তখন কাজি ছাহেব আরো অস্থির, পেরেশান, বেকারার এবং অসুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেলো।
এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য ইবরত নছিহতের বিষয় হলো, কাজি ছাহেব পবিত্র আশূরা শরীফকে সম্মান না করার কারণে জান্নাতের দু’টি বালাখানা থেকে মাহরুম হল। নাঊযুবিল্লাহ!
আর খ্রিস্টান ব্যক্তি আশূরা শরীফকে সম্মান করার কারণে ঈমান নসীব হল এবং সম্মানিত জান্নাত উনার বালাখানারও মালিক হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ!
আল্লাহপাক আমাদেরকে যথাযথ তাযীম তাকরীমের সাথে আশুরা শরীফ পালন করার এবং সম্মাণিত এই দিনের হক্ব আদায়ের মাধ্যমে দুনিয়াবী যাবতীয় নাজ নি
য়ামত এবং পরকালীন নিরাপত্তা ও নাজাত লাভ করার তৌফিক দান করুন৷
আমীন।