পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন : ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه- অর্থাৎ, কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ‘দ্বীন’ গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবূল করা হবেনা। সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫। ইসলামী আর্দশ ও শিষ্টাচারিতা অতি চমৎকার, ছোট-বড় সকলের প্রাপ্য অধিকার, স্নেহ, ভালবাসা, সম্মান, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের যে শিক্ষা ইসলামে দেয়া হয়েছে তা অন্য কোন ধর্মে দেখা যায় না।বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ সম্পর্কে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ ليس منا من لم يرهم صغيرنا ولم يوقر كبيرنا – অর্থাৎ, যে বড়দের সম্মান করেনা এবং ছোটকে স্নেহ করেনা সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।তিরমিযী, সুত্র: মিশকাত শরীফ ৪২৩ পৃষ্ঠা। ছোটদের প্রতি স্নেহ ও বড়দের সম্মান প্রদর্শন নবী-ই করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা, সম্মান প্রদর্শন বিভিন্নভাবে হতে পারে, যেমন- সালাম প্রদান, পিছনে চলা, বিনয়ী ও নিম্ন স্বরে কথা বলা, দেখলে সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়া, কাজ-কর্মে সহযোগীতা করা, প্রয়োজনীয় বস্তু এগিয়ে দেয়া, যাতয়াত ও সাক্ষাতের প্রাক্কালে হাতবুচি ও কদমবুচি (হাত ও পা চম্বুন) করা,অনেকে এ জায়েয ও সুন্নাতী আমল কদমবুচিকে নাজায়েয মনে করে, এমনকি উহাকে হারাম ও শিরক ইত্যাদি ফতোয়া দিতে ও দ্বিধা করেনা। বড় দুঃখ ও পরিতাপের ব্যাপার যে কোরআন-হাদীসে অনুমোদিত এমন একটি সুন্নাতী আমলকে শিরকসহ ইত্যাদি লাগামহীন বক্তব্য দ্বারা সরলমনা মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলে নিজেরা পথভ্রষ্ট হইতেছে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করতেছে। আর ক্রমশ সমাজ হচ্ছে শিষ্টাচার বঞ্চিত।তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা সুন্দরতম আদব-কায়দার অন্যতম পন্থা যে কদমবুচি ইসলামী শরীয়তে কতটুকু অনুমোদিত তা পাঠক সম্মুখে উপস্থাপনই এ প্রয়াস। নিন্মে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত দলীল পেশ করা হল : হাদীস : عن زارع وكان فى وفد عبد القيس قال لما قدمنا المدينة وجعلنانتبادر من فنقبل يد رسول الله صلى الله عليه وسلم ورجله رواحلنا অর্থাৎ হযরত যারেঈ রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু যিনি আব্দুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা যখন মদীনা শরীফে আগমন করলাম তখন আমাদের বাহন হতে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম এবং রসূল এ করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র হস্ত মোবারক ও পা মোবারক চম্বুন করলাম।আবূ দাউদ শরীফের সূত্রে মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃষ্ঠা: ৪০২। হাদীস : عن صفوان بن عسال ان قوما من اليهود قبلوا يد النبى صلى الله عليه وسلم ورجله অর্থাৎ, হযরত ছাফওয়ান বিন আসলাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই ইয়াহুদীদের একটি গোত্র হুজুর এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র হাত ও পা মোবারক চুম্বন করেন।সূত্র: ইবনে মাজাহ পৃ: ২৯২। হাদীস: হযরত বুরাইদা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- سأل أعربى النبى صلى الله عليه وسلم أية فقال له قل لتلك الشجرة رسول الله صلى الله عليه وسلم يدعوك فقال فمالت الشجرة عن يمينها وشمالها وبين يديها وخلفها فقطعت عروقها ثم جاءت يتخذ الارض تجر عروقها مغبرة حتى وقعت بين يدى رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم قال له السلام عليك يا رسول الله قال الاعرابى مرها فلترجع الى منبتها فرجعت فدلت عروقها فاستوت فقال الاعربى ائذن لى اسجد لك قال لو أمرت احدا ان يسجد لاحد لامرت المرأة ان تسجد لزوجها قال فأذن لى ان اقبل يديك ورجليك فاذن له অর্থাৎ, একজন বেদুঈন হুজুর এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র কাছে মুজিযা দেখতে চাইল, হুজুর এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেদুঈনকে এরশাদ করলেন ওই বৃক্ষটাকে বলো আল্লাহর রসূল তোমাকে ডাকছেন, সে যখন বললো বৃক্ষ তার ডানে-বামে, সম্মুখে পেছনে ঝুকল তখন ওটার শিকড়গুলো ভেঙ্গে গেল। তারপর তা মাটি খোদাই করে শিকড়গুলো টেনে বালি উড়িয়ে হুজুর এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র সম্মুখে এসে দাড়াল এবং বলল আস্সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ! বেদুঈন বললো “আপনি তাকে আদেশ করুন যেন এটা ওখানে (উৎপত্তিস্থল) ফিরে যায়” তাঁর নির্দেশে ওটা ফিরে গেল এবং তার শেকড়গুলোর উপর গিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালো। বেদুঈন বললো “আমাকে অনুমতি দিন আমি আপনাকে সিজদা করবো” তিনি এরশাদ করলেন, “যদি কাউকে সাজদাহ করার হুকুম দিতাম তাহলে স্ত্রীকে আদেশ দিতাম সে যেন তার স্বামীকে সাজদাহ করে।” বেদুঈন লোকটি আরজ করলো “হুযুর তাহলে আমাকে আপনার হস্ত ও পদদ্বয় মোবারক চুম্বন করার অনুমতি দিন” তিনি (নবীজী দঃ) তাকে অনুমতি প্রদান করলেন।সূত্রঃ শিফা শরীফ, দালাইলুন্নুবয়্যাহ আবু না’ঈম, পৃষ্ঠা- ৩৩২। হাদীস : وقال النبى صلى الله عليه وسلم من قبل رجل امه فكان قبل عنبة الجن প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি তার মায়ের পা চুম্বন করবে সে যেন বেহেশতের চৌকট চুমু খেল।মাবসুত লিস সারাখছি, খন্ড-১০, পৃষ্ঠা: ১৪৯। হাদীস : عن ذكوان عن صهيب قال رايت عليا يقبل يد العباس ورجله অর্থাৎ হযরত যাকওয়ান রদ্বিয়াল্লাহু হযরত ছুহাইব সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুকে (স্বীয় চাচা) হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহুর হাত ও পা যুগল চুম্বন করতে দেখেছি।সূত্রঃ মিশকাত শরীফ। কদমবুচির শরয়ী অনুমোদনে ফোক্বাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীনে এজামদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য : হযরত আল্লামা ইমাম আইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন- قال الامام العينى بعد كلام فعلم اباحة تقبيل اليد والرجل والرأس كما علم من احاديث المتقدمة اباحتها على الجبهة وعلى العينين وعلى الشفتين على وجه المبرة والكرام অর্থাৎ, হাত চুম্বন, কদমবুচি, মাথা বুচি, ও ইত্যাদির বৈধতা প্রমানিত হলো। যেভাবে বর্ণিত হাদীস হতে কপালে, দুই চোখের মাঝে, দু’ঠোটের উপরে চুমু দেয়ার বৈধতা প্রমাণিত হল, তবে এ সকল ক্ষেত্রে চুম্বন তখন জায়েয যখন সম্মান ও বরকত হাসিল উদ্দেশ্য হয়।সূত্রঃ রদ্দুল মোখতার, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা- ৩৮০। * পাক ভারত উপমহাদেশের সর্বজন স্বীকৃত অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ আব্দুল হক মহাদ্দিসে দেহলভীর অভিমতঃ قال الشيخ عبد الحق المحدث الدهلوى: وفى هذا الحديث دليل على جواز تقبيل الارجل- অর্থাৎ, হযরত শায়খ এ দেহলভী রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বিশিষ্ট সাহাবী হযরত জারে কর্তৃক বর্ণিত কদমবুচি অনুমোদিত হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, (মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি চিত্তে) বুর্জগানে দ্বীন ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের পদযুগল চুমু দেয়ার বৈধতা অত্র হাদীস দ্বারা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত। কদমবুচির বৈধতায়“ফতুয়ায়ে রশিদিয়ার” মধ্যে প্রশ্নোত্তরে বলেন- وفی الفتاویٰ رشیدیہ: سوال:کسی شخص کے لئے تعظیم کو کھڑا ہو جانا اور پاوں پکڑنا اور چومنا تعظیما درست ہے یا نہیں؟ جواب: برائے تعظیم دینداروں کے لئے کھڑا ہونا درست ہے اور پاوں چومنا اس جیسی شخص کا بھی درست ثابت ہے۔ প্রশ্ন: কোন ব্যক্তির সম্মানে দাড়ানো বা তাকে কদমবুচি করা বৈধ কিনা ? উত্তর: দ্বীনদার ব্যক্তির সম্মানে দাড়ানো ও তাদের পায়ে চুমু খাওয়া বৈধ এবং তা হাদীসে রসূল দ্বারা প্রমাণিত। তফসীরে মারিফুল কুরআনের লেখক মুফতি শফি সাহেবের অভিমত : حضرت شیخ محمد عابد سندھی نے اپنی رسالہ میں تحریر فرمایا کہ تعظیم و تکریم کیلئے دست بوسی یا قدم بوسی صرف ان لوگوں کی جائز ہے جو عالم صالح یا سلطان عادل ہویا کوئی دینی شرف و بزرگی رکھتا ہو۔[ذکر الشفعی فی جواھر الفقہ صفحہ،১৮৫ جلد،৮] অর্থ- তিনি বলেন, হযরত শায়খ মুহাম্মদ আবেদ সিনদী বলেছেন, তাকওয়াবান আলেম, ন্যায়পরায়ন বাদশা, ধর্মীয় দৃষ্টিতে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী শুধুমাত্র এমন লোকদের হাত ও পা চুম্বন করা জায়েয। ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া গ্রন্থে আছে جو شخص واجب الاکرم ہو اس کی قدم بوسی کے اجازت ہیں لیکن اعتقاد میں غلو نہ ہو اور سجدہ کی ھیّت نہ ہوئی پائی۔ অর্থ, যে ব্যক্তি সম্মানের পাত্র তার কদমবুচি করা বৈধ। তবে ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং সেজদার মত হবেনা। মৌলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেবের অভিমত : اس حدیث پہ بھی معلوم ہوا ہے یہ جو محبین کے عادت ہے کہ پیر کے ہاتھ کو یا پیشانی وغیرہ کو بوسہ دیتے ہیں اسکا بھی کچھ حرج نہیں البتہ اذن شرعی سے تجاوز نہ چاہئے۔ অর্থ, তিনি “আওাকাশুফ” গ্রন্থের একটি হাদীস উদ্ধৃত করে বলেন, এই হাদীসের জ্ঞাতব্য মূল কথা হল- পীরের প্রায় মুরীদগণের অভ্যাস হল স্বীয় পীরের হাত, পা ও কপালে চুম্বন করা। সুতরাং এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে এ ক্ষেত্রে শরয়ী হুকুমের কোন ব্যাত্যয় যাতে না ঘটে। বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ, সাহাবায়ে কেরামের আমল ও বিশ্ব বরেন্য ওলামায়ে কেরাম-এর অভিমত ও আমল দ্বারা প্রমাণিত হল হাত ও কদমবুচি শুধু জায়েয নয়’ বরং সুন্নাত।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে বারো বাজারে পর্যটন নগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে মুহম্মদ আলী রেজা রাজু
দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে বারো বাজারে পর্যটন নগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে মুহম্মদ আলী রেজা রাজু ভাই তোমার জন্য শুভ...
-
রহমত ব্যতীত কারো পক্ষে পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় হযরত মুজাদ্দিদে আ’যম মুর্শিদ কিবলা আলাইহিস সালাম বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত ব্...
-
মুসলমানদের বাদ দিয়ে কমজাত বিধর্মীদের ক্ষমতায়িত করার পরিণতি। ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের মুসলমানরা, বিশেষ ক...

No comments:
Post a Comment