ভাস্কর্য আর মূর্তির মাঝে যারা পার্থক্য সৃষ্টি করতে চায় তারা মূলত সম্মানিত পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ তথা পবিত্র ইসলামী শরীয়ত উনার বিষয়ে গণ্ডমূর্খ, জাহিল।
লেখক: আল্লামা মুফতী শুয়াইব আহমদ গবেষক- মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত ফারূক্বে আযম আলাইহিস সালাম তিনি একবার পবিত্র তাওরাত শরীফ উনার একখানা কপি নিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছোহবত মুবারকে এসে তা পাঠ করতে লাগলেন। এর কারণে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চেহারা মুবারকে অসন্তুষ্টির ভাব ফুটে উঠলো তৎক্ষণাৎ উনার অসন্তুষ্টি মুবারক থেকে সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি পানাহ চাইলেন এবং উনার সন্তুষ্টি মুবারক আরজু করলেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার কসম করে ইরশাদ মুবারক করলেন, এখন যদি স্বয়ং হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম (যার উপর তাওরাত শরীফ নাযিল হয়েছে) তিনি হায়াতে থাকতেন তাহলে অবশ্যই তিনিও আমার অনুসরণ করতেন। (দারিমী, মিশকাত, মিরকাত)
উল্লিখিত এ পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রতিভাত হলো, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম আসার পর আর কোন দ্বীন-ধর্ম বা মতবাদের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা, আইন-কানুন তা সম্মানিত ওহী মুবারক দ্বারা নাযিলকৃত হোক অথবা মানবরচিত হোক তা মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও অনুসরনীয় নয়। বরং তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য ও পরিহারযোগ্য।
উল্লেখ্য, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার উছূল বা দলীলসমূহ ৪ খানা। ১. পবিত্র কুরআন শরীফ, ২. পবিত্র হাদীছ শরীফ, ৩. পবিত্র ইজমা শরীফ, ৪. পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ।
অর্থাৎ মুসলমানদেরকে কোনো কিছু করতে হলে উক্ত ৪ খানা দলীলের ভিত্তিতেই করতে হবে।
অতএব, যে ইতিহাস বা ঐতিহাসিকের বর্ণনা উক্ত সম্মানিত দলীল চতুষ্ঠয়ের মুখালিফ তা মোটেই অনুসরণীয় ও গ্রহণযোগ্য নয়।
আরো উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে প্রসিদ্ধ মতে, ৬৬৬৬টি পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের মধ্যে এক হাজার পবিত্র আয়াত শরীফ ওয়াদা সংক্রান্ত, এক হাজার পবিত্র আয়াত শরীফ ভীতি প্রদর্শন সংক্রান্ত, এক হাজার পবিত্র আয়াত শরীফ আদেশ সংক্রান্ত, এক হাজার পবিত্র আয়াত শরীফ নিষেধ সংক্রান্ত, এক হাজার পবিত্র আয়াত শরীফ ঘটনা সংক্রান্ত, এক পবিত্র হাজার আয়াত শরীফ সংবাদপূর্ণ, পাঁচশ পবিত্র আয়াত শরীফ হালাম-হারাম তথা আহকাম সম্পর্কে, একশ পবিত্র আয়াত শরীফ দোয়া ও তাসবীহ সংক্রান্ত এবং ছিষট্টি পবিত্র আয়াত শরীফ নাসিখ-মানসূখ সংক্রান্ত। (তাফসীরে কাশশাফ, মারাকিউল ফালাহ, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা দুররিল মুখতার)
স্মরণীয় যে, হালাল-হারাম তথা আহকাম সাব্যস্তকারী পাঁচশ পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের অন্তর্ভুক্ত বিশেষ একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ হচ্ছেন পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ উনার ৩০নং পবিত্র আয়াত শরীফ। উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْاَوْثَانِ
অর্থ: “তোমরা মূর্তিসমূহের খারাবী, অপবিত্রতা, নাপাকী, নিষিদ্ধতা বা শাস্তি থেকে বেঁচে থাকো।” (তাফসীরে আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস)
অনুরূপ আরো একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
يَآ أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوْهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ধারণকারী তীর এসবগুলোই শয়তানে কাজ। অতএব, এগুলো থেকে তোমরা বিরত থাকো। অবশ্যই তোমরা সফলতা লাভ করবে।” (পবিত্র সূরা মায়িদাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৯০)
উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনাদের দ্বারা মূর্তিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ মূর্তি মানেই হারাম তা যে নামেই হোক এবং যে কারণে বা উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হোক।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যারা প্রাণীর মূর্তি তৈরি করবে, ক্বিয়ামতের দিন তাদের কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। এবং তাদেরকে বলা হবে, যে মূর্তিগুলো তোমরা তৈরি করেছ, সেগুলোর মধ্যে প্রাণ দান করো।” (বুখারী শরীফ ২য় জি:, ৮৮০ পৃষ্ঠা, মুসলিম শরীফ ২য় জি:, ২০১ পৃষ্ঠা)
হযরত মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “আমি বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান)
হযরত আবূ উমামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন সমস্ত জাহানের জন্য রহমতস্বরূপ এবং হিদায়েতস্বরূপ। আর আমাকে আদেশ মুবারক করেছেন বাদ্যযন্ত্র, মূর্তি, ক্রুশ ও জাহিলী কাজসমূহ ধ্বংস করার জন্য।” (মুসনাদে আহমদ শরীফ)
সাইয়্যিদুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। একবার তিনি একটি আসন খরিদ করলেন, তাতে অনেকগুলো প্রাণীর ছবি ছিল। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি (বাহির থেকে) সেটা দেখে; ঘরে প্রবেশ না করে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি উনার চেহারা মুবারকে অসন্তুষ্টির ভাব দেখতে পেলাম। উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, তখন আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের নিকট তওবা করছি। বলুন, অসন্তুষ্টির কি কারণ? তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, এই আসনটি কেন? আমি বললাম, আপনার বসার এবং বিছানা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আমি এটা খরিদ করেছি। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, এই সমস্ত ছবি যারা তৈরি করেছে, ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা বানিয়েছ তাতে জীবন দান কর, অতঃপর তিনি বললেন, হযরত ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম কখনো এমন ঘরে প্রবেশ করেন না, যেই ঘরে (প্রাণীর) ছবি থাকে। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত, মিরকাত)
মোট কথা, মূর্তি হোক, ভাস্কর্য হোক, প্রাণীর ছবি হোক এবং সেগুলোর আরাধনা করা হোক কিংবা না করা হোক সম্মানিত দ্বীন ইসলামে তা নিষিদ্ধ ও হারাম এবং জায়িয মনে করা কাট্টা কুফরী এবং চির জাহান্নামী হওয়ার কারণ।
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের এতসব সুস্পষ্ট দলীল থাকার পরও কি করে বলা যেতে পারে- ‘ইসলাম মূর্তির বিরুদ্ধে নয়’। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!
দ্বিতীয়ত, সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার বরাত দিয়ে তারা বলে থাকে, ‘তিনি পুতুল ব্যবহার করেছেন’। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!
অথচ মূর্তি, ছবি বা ভাস্কর্যকে জায়িয প্রমাণ করতে গিয়ে তারা দলীল হিসেবে যে পবিত্র হাদীছ শরীফ উল্লেখ করেছে, উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা মানসূখ (রহিত) হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত। যেমন উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ‘শরহুল কিরমানী আলাল বুখারী’তে উল্লেখ আছে-“শিশুদের জন্য খেলনা পতুল বা মূর্তি ব্যবহার করাকে বৈধ প্রমাণ করতে গিয়ে কেউ কেউ দলীল হিসেবে এ পবিত্র হাদীছ শরীফ পেশ করে থাকে। উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা ছবি ও মূর্তি সম্পর্কিত অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা মানসূখ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এর হুকুম এখন আর বলবৎ নেই।” (হাশিয়াতুল বুখারী ২য় খ- ৯০৫ পৃষ্ঠা ৬নং হাশিয়াহ)
অতএব, পুতুল নিয়ে সম্পর্কিত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা সকলের মতেই মানসূখ। কেননা অসংখ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে মূর্তি, পুতুল, ভাস্কর্য, ছবি ইত্যাদি তৈরি করাকে সরাসরি নিষেধ করা হয়েছে এবং তৈরি করাকে কঠিন গুনাহের কারণ বলা হয়েছে।
এই চরম জাহিল ও কাট্টা মুনাফিকরা কি জানে না, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার শুরুতে অনেক বিষয় ছিল যা পরবর্তীতে মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে?
উদাহরণস্বরূপ পর্দার বিধান নাযিল হয়েছে পঞ্চম হিজরী সনে। পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাহ উনারা গইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে দেখা করতেন। এখন সেই বর্ণনা বা হাদীছ শরীফ দলীল হিসেবে গ্রহণ করে কি মহিলারা বেগানা পুরুষদের সাথে দেখা করতে পারবে? কখনোই না।
অনুরূপভাবে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার প্রথমদিকে মদ হারাম ঘোষণা করা হয়নি। পর্যায়ক্রমে তা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এখন প্রথমদিকের বর্ণনা বা পবিত্র হাদীছ শরীফ দলীল দিয়ে কেউ যদি মদ খায় বা মদের ব্যবসা করে তা কি জায়িয হবে? কখনোই নয়।
একইভাবে প্রথমদিকে নামাযের মধ্যে কথা বলা নিষেধ ছিল না, যার কারণে মুছল্লীগণ নামাযের বিষয়ে নামাযরত মুছল্লীদেরকে এবং অন্য বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও কথাবার্তা বলতেন। বুখারী শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত সেই হাদীছ শরীফ দলীল হিসেবে গ্রহণ করে এখন নামাযে কথা বলা যাবে কি? বললে নামায হবে কি?
এ ধরনের আরো অনেক বিষয়ই রয়েছে যা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার প্রথমদিকে নাজায়িয ও হারাম ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে তা নাজায়িয ও হারাম ঘোষণা করা হয়। উক্ত বিষয়সমূহের ন্যয় একটি হচ্ছে মূর্তি ও ছবি।
চরম জাহিল ও কাট্টা মুনাফিক ব্যক্তিটি ছবি ও পুতুল সংক্রান্ত সাইয়্যিদুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার মানসূখ বর্ণনাসমূহ উল্লেখ করেছে, কিন্তু উনার থেকে ছবি, মূর্তি হারাম হওয়া সংক্রান্ত যে পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহ উল্লেখ আছে, তা সে উল্লেখ করেনি। একখানা হাদীছ শরীফ শুরুতেই উল্লখ করা হয়েছে। আরও অনেক হাদীছ শরীফ রয়েছে, যেমন-
উম্মুল মু’মনীন সায়্যিদাতুনা হযরত আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বীয় পবিত্র হুজরা শরীফে (প্রাণীর) ছবিযুক্ত কোনো জিনিসই রাখতেন না। দেখলেই ভেঙ্গে চূর্ণ করে দিতেন। (পবিত্র বুখারী শরীফ, পবিত্র মিশকাত শরীফ)
পবিত্র হাদীছ শরীফসমূহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে- খোদ সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ আলাইহাস সালাম উনার বর্ণনা মুবারকে উল্লেখ রয়েছে যে, ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে হারাম।
কাজেই মূর্তি, ভাস্কর্য, ছবি ইত্যাদি জায়িয সাব্যস্ত করতে হলে উক্ত আহকাম সংক্রান্ত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মোকাবেলায় আহকাম সংক্রান্ত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ দলীল দিতে হবে। অন্যথায় কস্মিনকালেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা মূর্তি, ভাস্কর্য, ছবি তৈরি করা, আঁকা, তোলা ইত্যাদি হারাম ও কুফরী এবং তার পরিণতি জাহান্নাম এ সংক্রান্ত আহকাম সংক্রান্ত বহু পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ বিদ্যমান।
তা না করে উক্ত চরম জাহিল ও গ-মূর্খ লোকটি মূর্তির পক্ষে এমনসব দলীল উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে, যা তাকে কাট্টা মুনাফিক ও কাট্টা কাফিরে পরিণত করেছে এবং সম্মানিত দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে চরম অজ্ঞ, গ-মূর্খ ও আশাদ্দুদ দরজার জাহিল ও ফেতনাবাজ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
তৃতীয়তঃ এই মূর্তিপ্রেমী মুনাফিকরা বলে থাকে, “তখন সম্মানিত কা’বা শরীফ উনার দেয়ালে ৩৬০টি মূর্তি ও অনেক ছবির সঙ্গে হযরত ঈসা রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উনার সম্মানিত আম্মা আলাইহাস সালাম উনাদের ছবিও ছিল। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উনার সম্মানিতা আম্মা আলাইহাস সালাম উনাদের ছবি বাদে বাকি সব ছবি মুছে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।”
উপরোক্ত বর্ণনা ও ইতিহাস সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুল। সঠিক বর্ণনাসমূহ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
যেমন-
(১) হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, “পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের দিন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে নির্দেশ মুবারক দিলেন- যেন তিনি পবিত্র কা’বা শরীফ উনার ভিতরের সব ছবি/মূর্তি নষ্ট করে দেন। অতঃপর ছবি/মূতি নষ্ট করার আগে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র কা’বা শরীফ উনার ভিতর তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেননি। (পবিত্র আবু দাউদ শরীফ, পবিত্র বায়হাকী শরীফ)
(২) হযরত উসামা বিন যায়িদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে পবিত্র কা’বা শরীফ উনার মধ্যে প্রবেশ করলাম। তিনি তাতে কিছু ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি এক বালতি পানি আনতে আদেশ মুবারক করলেন। আমি পানি আনার পর তিনি তা দিয়ে সেগুলো মুছে দিলেন এবং ইরশাদ মুবারক করলেন- ‘মহান আল্লাহ পাক তিনি ঐ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করুন, যারা এমন জিনিসের আকৃতি দেয় যা তারা সৃষ্টি করতে পারবে না”। (পবিত্র আবু দাউদ শরীফ)
এ সমস্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সমস্ত মূর্তি ও ছবি নষ্ট করেন এবং এতে হযরত রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম এবং উনার সম্মানিতা আম্মা আলাইহাস সালাম উনাদের প্রতিকৃতি অক্ষুণœ থাকার কেনো প্রমাণ নেই। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত রূহুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উনার সম্মানিতা আম্মা আলাইহাস সালাম উনাদের ছবি নষ্ট করতে নিষেধ করেন, তা কেউ বর্ণনা করেননি। এটি সম্পূর্ণই বানোয়াট।
যেমন ইবনে ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি জীবনী গ্রন্থের দুই ধারক হযরত ইমাম তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ও হযরত ইবনে হিশাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা কেউই এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেননি। এ দুটো জীবনী গ্রন্থ ছাড়া অন্য কোনো জীবনী গ্রন্থেও এর উল্লেখ নেই।
উল্লেখ্য, হিজরী ৮ম সনে পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের দিন স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম উনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সম্মানিত কা’বা শরীফ উনার মধ্যে অবস্থিত সমস্ত মূর্তি, ভাস্কর্য, ছবি ধ্বংস করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, মূর্তি, ভাস্কর্য, ছবি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করার পরেই অর্থাৎ হিজরী ৯ম সনে পবিত্র হজ্জ ফরয করা হয়। সুবহানাল্লাহ!
আরো উল্লেখ্য, অতীতের কোনো বিষয় সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মুখালিফ বা বিরোধী হলে তা মুসলমানদের জন্য গ্রহণ করা বা অনুসরণ করা জায়িয নেই। যেমন- আবুল বাশার হযরত আদম ছফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার যামানা থেকে শুরু করে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার যামানা পর্যন্ত আপন ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ জায়িয ছিল। তাই বলে কি এখন আপন ভাই-বোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়িয হবে? কখনোই নয়। কেউ যদি জায়িয মনে করে, সে কি মুসলমান থাকবে? বরং সে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হবে। তদ্রƒপ হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম উনার যামানায় মূর্তি, ভাস্কর্য থাকার দলীল সম্মানিত দ্বীন ইসলাম বা সম্মানিত মুসলমানদের জন্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
কাজেই প্রতিমা বলা হোক, মূর্তি বলা হোক, ভাস্কর্য বলা হোক প্রত্যেকটাই মূর্তি এবং প্রত্যেকটার হুকুম এক। প্রতিমা, মূর্তি, ম্যানিকিন, ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা চরম জিহালতি, গ-মূর্খতা ও মনগড়া। মনগড়া বা বানোয়াট কোনো কথা সম্মানিত দ্বীন ইসলাম ও সম্মানিত মুসলমানদের জন্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন-
هَاتُوْا بُرْهَانَكُمْ اِنْ كُنْتُمْ صَادِقِيْنَ
অর্থ: যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, তবে দলীল পেশ করো। (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ:পবিত্র আয়াত শরীফ ১১১)

No comments:
Post a Comment