সম্মানিত মুজাদ্দিদগণ প্রসঙ্গে-৪
হযরত আবু মানসূর মাতুরিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি ঃ তিনি চতুর্থ হিজরী শতকের সম্মানিত মুজাদ্দিদ (মুজাদ্দিদগণের ধারাবাহিকতায় তিনি তৃতীয়) এবং সম্মানিত মাতুরিদি আকিদার ইমাম।
মুতাযিলা আকিদা ভয়াবহভাবে মানুষকে গ্রাস করার পেছনে মূল কারণ ছিল শাসক শ্রেনীর পৃষ্ঠপোষকতা। মুতাযিলাদের উত্থান বনু উমাইয়্যাদের শাসনামল থেকে শুরু হয়েছিল। খলীফা হারুনুর রশীদের শাসনামল নাগাদ তারা বিশেষ পরিচয়ে একটি বিশেষ অবস্থানে এসে যায়। এরপর মামুনুর রশীদ তার স্বভাবগত মানসিক দুর্বলতার কারণে মুতাযিলাদের এ আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তাই সে যখন খলীফা পদে অধিষ্ঠিত হয় তখন মুতাযিলাগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের চীফ জাস্টিস হিসেবে ইবনে আবু দাউদকে নিয়োগ দেয়। সে মুতাযিলা মতবাদ তলোয়ারের জোরে সত্যপন্থী মুসলিম চিন্তানায়কদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে উন্মত্ত হয়ে ওঠে।
মামুন ২১৬ হিজরীতে সর্বপ্রথম প্রত্যেক মুসলিম প্রদেশের গভর্নরদের নিকট এ মর্মে ফরমান জারী করে যে, সরকারী পদস্থ ব্যক্তিরা যেন সর্বসাধারণের মাঝে খলকে কুরআনের আকিদা ঘোষণা করে, যে ঘোষণা করবে না তাকে বরখাস্ত করে দেয়া হবে। এরপর দ্বিতীয় ফরমান বাগদাদের গভর্নরের নিকট প্রেরণ করে এ মর্মে যে, সে যেন বাগদাদের নির্দিষ্ট সাতজন মুহাদ্দিসকে তার দরবারের হাযির করে। যে মুহাদ্দিসগণ তার বিরোধী বলয়ের বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। এ সাত জন উপস্থিত হলে মামুন তাদেরকে খলকে কুরআন সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। তারা সকলেই তখন মামুনের সাথে ভয়ে তার খলকে কুরআনের আক্বীদার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। খলীফার নির্দেশ অনুযায়ী তারা আলিম উলামা ও মুহাদ্দিসগণের একটি বিরাট সমাবেশে এ আক্বীদার প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু তবুও হকের পথে অবিচল মুহাদ্দিসগণ ও সর্বসাধারণ তাদের অবস্থানে দৃঢ়পদ রইলেন। এর কিছুদিন পর মুসলিম জাহানে ধরপাকড় শুরু হয়ে গেল। হযরত বশীর ইবনে ওলীদ কিন্দী এবং হযরত ইবরাহীম ইবনুল মাহদীকে কতল করা হলে প্রাণভয়ে অনেক বড় বড় আলিমের কদম টলে গেল। তারা এ ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপনের পথ অবলম্বন করলেন। অনেকেই গৃহকোণ অবলম্বন করলেন। প্রত্যেকেই আত্মরক্ষার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কতিপয় বাক্য উলামা ও সুফীদের মুখে তখন স্বাভাবিকভাবে শোনা যোতো। তারা বলতেন, এ যুগ হাদিসের দরস ও সুন্নাহ প্রচারের যুগ নয়। এটা হলো ক্রন্দন বিলাপের যুগ। সুতরাং আল্লাহ পাক উনার কাছে কাঁদাকাটি করো এবং সমুদ্রে ডুবন্ত ব্যক্তির মত দু'আ করতে থাকো। কেউ বলতেন (এ যুগে) তোমরা তোমাদের জিহবার হিফাজত করো এবং নিজেদের আত্মশুদ্ধির কাজে লেগে যাও। যা কিছু জান তা মেনে চলো এবং যা কিছু মন্দ তা পরিহার করে চলো। কেউ বলতেন এ যুগ নিরবতার যুগ এবং নিজের গৃহদ্বার রুদ্ধ করে বসে থাকার যুগ।
একমাত্র দ্বিতীয় মুজাদ্দিদ হযরত আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যদি সেদিন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ না করতেন তাহলে মুতাযিলা আকিদা আজ অবধি অতন্ত্য ভয়াবহ আকার ধারণ করতো। মুতাযিলা আকিদার মূলে কুঠারাঘাত করেন তিনি। উনার প্রতিবাদের কারণেই শাসকশ্রেনীর পক্ষ থেকেই মুতাযিলা আকিদা মুকাবিলা করার পদক্ষেপ নেয়া হয়। পরবর্তীতে তথাকথিত খলীফা আল মুতাওয়াক্কিল চারিদিকে “কালামুল্লাহ শরীফ কোন সৃস্টি নয় বরং আল্লাহ পাক উনার কালাম” এ বিষয়ে ফরমান পাঠালেও মানুষের অন্তরে মুতাযিলা আকিদা গেঁড়ে বসে ছিল। পাশাপাশি কারামাতি, জাহমিয়া ও মুজাসসিমা ফিরক্বার লোকেরা আকিদা বিষয়ে প্রচণ্ড ভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করে। তখন সম্মানিত তৃতীয় মুজাদ্দিদ ( চতুর্থ হিজরি শতক) হযরত আবু মানসূর মাতুরিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি মু’তাজিলী ফিরক্বার দাঁতভাঙ্গা জবাব প্রদান করেন। তিনি বিশুদ্ধ আকিদা ব্যাখ্যা করেন, প্রচার করেন এবং অসংখ্য কিতাব রচনা করেন। সে সময় কেবল ইসলাম উনার মাঝেই নানা ফিরকা প্রবেশ করেনি সাথে নন-মুসলিম অনেক সম্প্রদায়ের আকিদাও মুসলমান উনাদের বিভ্রান্ত করতে থাকে । Chalcedonian Christianity, Miaphysitism,Manichaeanism, Marcionism, Bardaisanism এদের আকিদা এসে মুসলমান উনাদের মাঝে মায়াজাল তৈরি করে ফেলে।
সম্মানিত তৃতীয় মুজাদ্দিদ ( চতুর্থ হিজরি শতক) হযরত আবু মানসূর মাতুরিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শিক্ষকগণঃ
হযরত আবু নাসর আহমাদ বিন আব্বাস বিন হুসাইন আল ইয়াযি রহমতুল্লাহি আলাইহি , হযরত আবু বকর আহমদ বিন ইসহাক বিন সালেহ আল জুযজানি রহমতুল্লাহি আলাইহি (আল ফারক ওয়াত তাময়ীয গ্রন্থের লেখক), হযরত নুসাইর বিন ইয়াহইয়া আল বালখি রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত কাদি আল-কুদাত (প্রধান বিচারপতি) মুহাম্মাদ বিন মুকাতিল আর-রাযি রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমূখ ইসলামি শিক্ষাবিদগণ ছিলেন উনার শিক্ষক ।
মাতুরিদী আকিদার ভিত্তিঃ
আশায়েরী ও মাতুরিদী কোন নতুন আকিদা নয়। হানাফী আকিদার বাহিরের কোন আকিদা নয়। আকিদা একই। শুধু অন্য ফিরক্বা তথা মুতাযিলাদের থেকে নিজেকে আলাদা করতেই মাতুরিদী ও আশআরী বলা হয়ে থাকে। মূল কথা হল হযরত ইমামে আযম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আক্বিদা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বিদা। সংকলিত না থাকার কারণে হযরত ইমামে আযম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আক্বিদা পাওয়া কস্টকর। এ জন্য আক্বিদার ক্ষেত্রে হযরত ইমাম আশয়ারি রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম মাতুরুদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মাযহাবের নাম থাকলেও হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আক্বিদার ভিন্ন কোন মাযহাব পাওয়া যায় না। কারণ ফিকহের ক্ষেত্রে সম্মানিত প্রথম মুজাদ্দিদ হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাযহাব পরিপূর্ণ ঠিক আক্বিদার ক্ষেত্রেও ইমাম আশআরি রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং সম্মানিত মুজাদ্দিদ হযরত ইমাম মাতুরিদি রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের আকিদার বিষয় পরিপূর্ণ ।
হযরত আবু মানসূর মাতুরিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখিত কিতাবসমূহঃ
• কিতাবুত তাওহিদ (একত্ববাদের গ্রন্থ)
• কিতাবু রাদ্দি আওয়াইল আল আদিল্লা, (মুতাযিলা মতবাদ বিষয়ক একটি বইয়ের খণ্ডন)
• রদ্দুত তাহযীব ফিল জাদাল, মুতাযিলা মতবাদের আরেকটি বইয়ের খণ্ডন)
• কিতাবু বায়ানে আহওয়াম আল মুতাযিলা (মুতাযিলাদের ভ্রান্ত মতবাদের ব্যাখ্যা উদগাঠন)
• কিতাব তাওয়ীলাতুল কোরআন ('পবিত্র কোরআন শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ')
• কিতাবুল মাকালাত
• উসুল আল ফিকহ বিষয়ক গ্রন্থ মাআখিয আল শরয়ী
• আল জাদাল ফি উসুল আল ফিকহ
• রদ্দু উসুলিল খামসা, আবু মুহাম্মাদ আল বাহিলির মুতাযিলা পাঁচ মূলনীতির খণ্ডন
• রদ্দুল ইমামা, ইমামি শিয়াদের মতবাদের খণ্ডন;
• আর রদ্দ আলা উসুলিল কারামাতিয়া
• রাদ্দ ওয়াইদ আল ফুসসাক।
Abm Ruhul Hassan

No comments:
Post a Comment